বাস চালকের মেয়ের নোবেল জয়
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রখ্যাত আইনজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারক নাভি পিল্লাইয়ের ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ের খবর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নজিরবিহীন তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। এই পুরস্কার প্রাপ্তির প্রতিক্রিয়ায় তিনি মার্কিন নেতৃত্বের প্রতি কটাক্ষ করেন এবং এর ফলে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের তীব্র অসন্তোষ ও সমালোচনার মুখোমুখি হন।
পুরস্কারের খবর পাওয়ার পর জার্মানির নুরেমবার্গের ঐতিহাসিক আদালত কক্ষে দাঁড়িয়ে ৮৫ বছর বয়সী এই বিচারক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নোবেল পাওয়ার দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষাকে ইঙ্গিত করে সূক্ষ্ম রসিকতা করেন। পিল্লাই হাসতে হাসতে বলেন, ‘আপনারা যদি আরেকটু জোরে হাততালি দেন, তবে আমি এই পুরস্কারটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে ভাগ করে নিতে পারি।’ তাঁর এই বুদ্ধিদীপ্ত কটাক্ষ বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তবে পিল্লাইয়ের এই নোবেল জয়কে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না ওয়াশিংটন ও তেল আবিব। গত বছর নাভি পিল্লাইয়ের নেতৃত্বাধীন জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশন গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানকে স্পষ্ট ভাষায় ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করে আন্তর্জাতিক আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল। এর জেরে ইসরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই পুরস্কারের তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে “ইসরাইলবিরোধী ঘৃণা ও কুসংস্কারকে বৈধতা দেওয়ার একটি কিম্ভূত অস্ত্র” হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ নাভি পিল্লাইকে “আমেরিকা ও ইসরাইল বিদ্বেষী” বলে তীব্র আক্রমণ করেছেন। এই নোবেল ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় মার্কিন প্রশাসন নাভি পিল্লাইয়ের স্মৃতিবিজড়িত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ওপর নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিলে বৈশ্বিক কূটনৈতিক উত্তেজনা চরম রূপ ধারণ করে।
শৈশব ও বর্ণবাদের ঘোর অন্ধকার:
নাভি পিল্লাই (পুরো নাম: নাভানেথেম পিল্লাই) ১৯৪১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান শহরের ক্লেয়ারউড বস্তির এক দরিদ্র তামিল অভিবাসী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষরা মূলত অবিভক্ত ভারতের তামিলনাড়ু থেকে ১৯ শতকের শেষভাগে চুক্তিবদ্ধ দাস-শ্রমিক হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকায় আখের খামারে কাজ করতে এসেছিলেন।
পিল্লাইয়ের বাবা ছিলেন সাধারণ একজন বাস চালক। সংসারে ছিল তীব্র অভাব-অনটন আর সাত ভাইবোনের ভিড়। বর্ণবাদের ঘোর অন্ধকারে এমন এক পরিবারে তিনি বড় হয়েছেন, যেখানে কোনো বই বা খবরের কাগজ ছিল না।
নাটাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেলেও পিল্লাইয়ের দরিদ্র বাবার পক্ষে খরচ চালানো অসম্ভব ছিল। তখন তাঁর ক্লেয়ারউড বস্তির স্থানীয় সম্প্রদায় নিজেরা চাঁদা তুলে এবং চার্চ থেকে একটি ছোট স্কলারশিপের ব্যবস্থা করে তাঁর পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছিল। সমস্ত সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাধা টপকে তিনি শিক্ষার প্রতি অনড় থাকেন এবং নাটাল প্রদেশের প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী হিসেবে নিজস্ব ল ফার্ম প্রতিষ্ঠা করেন।
ল ফার্ম খোলার পর শ্বেতাঙ্গ বিচারকরা প্রায়ই তাঁকে এজলাসে দেখে অবজ্ঞা করে বলতেন, “তুমি কে? কাঠগড়ার আসামি নাকি পরিচ্ছন্নতাকর্মী?” এমন অপমানের মুখেও তিনি পিছপা হননি। পরবর্তীতে তিনি প্রথম দক্ষিণ আফ্রিকান হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা হার্ভার্ড ল স্কুল থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।